এই ফুলটার সঙ্গে গতকালই পরিচয় হল। সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরীর মতো রং। ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠেছে যেন। তারপরই মেঘে ছাওয়া পাহাড়ের সঙ্গে আলাপ। এমনিতে জুকু লিলি হলেও ওকে চিত্রাঙ্গদা ফুল নাম দিয়েছি আমি। যে বিজ্ঞানী খুঁজে পেয়েছিল সে নাম রেখেছিল Lilium Chitrangadae, নিজের মায়ের নামে। সত্যিই এ তো রাজেন্দ্রনন্দিনীই বটে। মণিপুর-নাগাল্যান্ড সীমান্তে নিজের মতো রোদ পোহাচ্ছে চিত্রাঙ্গদা ওরফে চিত্রা। মাঝে মাঝে উঁকি মেরে যে অঙ্ক খাতা নামিয়ে পাহাড়টাকে দেখছে না এমনটা নয়। এদিকে বেশি দেখলে আবার ওই ঘাসের বাড়ির ছেলেটা তৃণাঙ্কুর খিলখিল করে হাসবে। বলবে, ''হ্যাঁ রাজার মেয়ে তো, তাই নিয়ম মানতে হয়! চোখ মেলা যায় না! কেন রে চিত্রা এত সঙ্কোচ তোর।''
উফ বিরক্ত লাগে তৃণাঙ্কুরটাকে। সবসময় চিত্রার মুখ ভার কি না দেখা চাই ওর।
একদিন কী হয়েছে, রোদ পোহাতে পাহাড়ের পাশেই এসে বসেছে। কিন্তু মাথা নিচু করে কী যেন লিখে চলেছে। বাবা বাঁচা গেল, আজ ঘাসের বাড়ির ছেলেটা নেই। থাকলেই তো শিস দোলাবে আর মাথা নাড়বে। তবে আজ পাহাড়ও মনে মনে একটু বেশিই খুশি যেন, রোদ ঝলমল করে হাসছে, প্রকাশ করতে পারছে না। চিত্রাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না। এদিকে চিত্রা শুনেছে এই পাহাড়কে নিয়েই যত যুদ্ধ। পাহাড় কার কাছে যাবে? কী জানি। এমনিই এ সময়টায় কাছে এসে বসে ও, ভাল লাগে। পাপড়িটা কি একটু মুড়ে গেল? এ সব মাথায় থাকে না। তবে একটা পোকা অনেকদিন ধরে ঘুরঘুর করছে মাথার উপরে। ভনভন শব্দে চিত্রার মাথায় ঝিম ধরে যায়। চোখ বুজে ফেলে ও। ওমনি পোকাটা মাথাটা ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। আসলে এই জুলাই মাস জুড়েই তো ও গোলাপি থেকে গুলাবি হয়ে ওঠে্। পাহাড়ের গায়ে এলিয়ে গড়াগড়ি খায় মনে মনে। আর ভাবে এ বার নিশ্চয়ই, আর তখনই আবার ঝিম ধরা শব্দে একের পর এক পোকা এসে পড়ে।
বৃষ্টি পড়তেই পাহাড়ের মুখটা যেন পালটে গেছে আজ। চিত্রার পাপড়ি ছুঁয়ে যাচ্ছে একের পর এক রোমশ আঙুল। ক্লিক ক্লিক শব্দ। উফ। একে অপরের চোখে তাকিয়ে থাকার ফুরসতটাও যে নেই। পাপড়িগুলো গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে করে চিত্রার। কেন এমন দেখতে হল ওকে। পাপড়ি গুটিয়ে মিশিয়ে নেওয়া যেত যদি। রাজার মেয়ে বলেই কি ওর পাপড়ি ছুঁয়ে দেখবে সবাই? ফড়িংটাও? কত ছোট থেকে চিনত চিত্রাকে। গোলাপি থেকে গুলাবি হওয়ার পরই ফড়িংটা পর্যন্ত পাপড়ির উপর বসে থাকছে রোজ এক টানা। খুব ব্যথা লাগছে। কে শুনবে। ও যে রাজার মেয়ে। ওর কষ্ট হয় নাকি। এ সব ভাবতে ভাবতেই আবারও বৃষ্টি। আহ, সব ব্যথা ভুলে যাবে ও, যদি একবার মেঘের চাদরটা পরে পাহাড় আসে আজ।  অল্প অল্প রোদের হাসি নিয়ে। ওই তো । ঠিকই দেখছে ও। জুকু লিলিইইইইইইইইইইইইইইই। জুকুউউউউউউউউ। ধুর। কী সব ভাবছে ও। নির্ঘাত জেগে জেগে স্বপ্ন। উঁহু না, মেঘের চাদর জড়িয়ে রোদের গয়না পরে পাহাড়ই আসছে আজ ওর দিকে। চিত্রাঙ্গদা? না। চিত্রা ? জুকু লিলিইইইইইইইইইইইইইইই। ডাকতে ডাকতে এগিয়ে আসছে। আচমকাই চারপাশ ঠান্ডা হয়ে গেল। পাহাড়টা যেন আর অন্যদিনের মতো নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর। আহ। চিত্রা। চিত্রা। ওঠ। ওঠ। আমার গায়ে এলিয়ে পড়ছিস যে আজ। চিৎকার করে ওঠে তৃণাঙ্কুর। না, চিত্রা আর ওঠে না। ঘাসের গায়ে ঠান্ডা নিথর চিত্রা শুয়ে পড়ে। পাপড়ি গুলো সব ছিড়ে গেছে, মিশে গেছে কোথায় কে জানে।  ঘাসের বাড়ির ছেলে খুঁজে বেড়ায় বন্ধুকে। আসলে ঘাসের বাড়ির ছেলে তো তো স্কুলে যায়নি। ওকে কেউ বলে দেয়নি, জুকু মানে আসলে ঠান্ডা। এক্কেবারে ঠান্ডা। ঠিক ওরকমভাবেই শুয়ে আছে চিত্রা বছরের পর বছর। তবে মাঝে মাঝে কারা যেন দেখতে আসে ওকে। গোলাপি পাপড়ি ঝলমল করে ওঠে চিত্রার। শুধু তৃণাঙ্কুরের সঙ্গে আর কখনও গল্প করা হয়না ওর। এত সময় কই হাতে?

ঠান্ডা, নিথর চিত্রা সব ভুলে গেলেও গোলাপি পাপড়ি মেলে ধরতে ভোলে না।পাপড়ি মেলে ধরে সবার সামনে। এখন ওর নাম জুকু লিলি।

(এই ছবিটা গুগল থেকে নিয়েছি। তবে এই কিশোরী ফুলটার সঙ্গে পরিচয় হল আমাদের জঙ্গলপাগলা শুভ্র দার মাধ্যমে। একটা ছবি গতকালই পোস্ট করেছিল ওই দাদা। ফুলটা দেখেই মনকেমন করছিল পাহাড়ের জন্য। কবে যাব জানা নেই যে। তাই আবোলতাবোল লেখা। মার্জনা চেয়ে রাখলাম আগেভাগেই)

Comments

  1. গোলাপী থেকে গুলাবি হলেই ত চিত্তির

    ReplyDelete
    Replies
    1. এত সুন্দর ফুল। কালকেই জানলাম ওর কথা। তাই ভাবলাম ভুলে যাওয়ার আগে আজ লিখে রাখি।

      Delete
  2. Awesome awesome. দারুণ হয়েছে।

    ReplyDelete
  3. বাহ চমৎকার হয়েছে।

    ReplyDelete
  4. খুব সুন্দর লিখেছিস। 💐

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনার নাম কী। নাম দেখায় না কেন

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog